শাহানাজ শাহীন -এর উপন্যাস ‘ধাওয়া‌’

প্রকাশিত: ৫:১০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২১
লেখক শাহানাজ শাহীন

মি সবসময় চাইতাম মেঘ আমার সাথে ভাব করুক । এক সাথে খেলুক । দোলনায় দুলুক । মাঠে গিয়ে বিকেলে ঘুড়ি ওড়াক । ফড়িং ধরুক ।

তারপর বড় হলে আমাকে বিয়ে করুক । আমাদের সংসার হবে । ছেলেপুলে হবে । মায়ের মতো আমিও সেরা মা হবো । এগুলো সবই ছিল আমার কল্পনা । মেঘ আমাদের প্রতিবেশীর ছেলে । আমাদের চেয়ে ওরা অনেক ধনী । দোতলা বাড়িটিরদিকে তাকালেই অনুমান করা যায় । এর ইটের গাঁথুনি, দরজা, জানালা, বারান্দা ও সামনের ফটক সব কিছুতেই উচ্চবিত্তের একটা ছোঁয়া লেগে আছে । বাড়ির ফটকে নেম প্লেটে লেখা আছে “আমাদের বাড়ি” । সতন্ত্র একটি নাম । সেই থেকে এ বাড়ির প্রতি আমার বিশেষ ভালবাসা তৈরি হয় । আমি কখনোই একা থাকতে চাইতাম না । এর শুরুটা হয় নব্বইয়ের দশকে এক গ্রীষ্ম থেকে ।
আমার দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠবার আগে ।

একদিন বিকেলে । আমি বাড়ির সামনে রাস্তায় বসে আছি । মেঘেদের খয়েরি রংয়ের জিপ এসে গেটের সামনে থামলো ।
গাড়ির জানালা দিয়ে মেঘ বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে । আমি দেখছিলাম ওদের গাড়িটি ।
বাহ, কতো সুন্দর ঝকঝকে একটি গাড়ি । ওদের জিপের পিছনে একটি বড় মাল বুঝাই ট্রাকও এসে থামল ।

এই তো আমরা এসে গেছি । মেঘের বাবা গাড়ি থেকে নেমে বললেন এটা আমাদের নতুন বাড়ি । আজই তারা সপরিবারে এ বাড়িতে এসে উঠেছে। দোতলা বাড়ি । ঢুকতেই কাঠের বিশাল দরজা ।

মেঘের বাবা বলছেন –কেমন লাগছে তোমাদের বাড়িটি ?

পিছনের সিটে বসা তার বড় বোন ভালবাসা বলে,
আমার খুব পছন্দ হয়েছে বাবা ।

বাবা খুব নিরিবিলি । মেঘ বললো

বাবা আমার রুমে কি রঙ করেছো ?
ভালবাসা বাবার কাছে জানতে চাইল ।

আহা অপেক্ষা করো । এতো উতলা হচ্ছ কেনো? বাড়িতে ঢুকলেই সব

দেখতে পারবে । মিসেস ফাহমিদা মেয়েকে বললেন,

তিনি গাড়ির দরজা খুলে ছেলেকে নামতে সাহায্য করলেন ।
ধনী পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য বাবা মায়ের সে কি যত্ন ।

গরিবের এসব আহলাদ দেখানোর সময় নেই । নেই মধ্যবিত্তের ।

এই দুই শ্রেণীর জীবন পার হয় বেঁচে থাকার লড়াই করে । এরা বাবা মায়ের কাছে

কেবল তিন বেলা পেট ভরে খাওয়ার আশা করে ।
এতেই তাঁরা খুশি । ধনীদের অভাব নেই ।
কিন্তু অভাব না থাকার অভাব আরো ভয়াবহ ।
শাহরুখ পুত্র জেলখানায় । সে অভাব না থাকার

অভাবে ড্রাগ সেবনে আসক্ত হয়ে যায় । এতে সে এক ধরনের তৃপ্তি পায় অভাব পুরনের ।
চলো চলো ভেতরে যাই । ভালবাসা দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে

গেটের সামনে । ভালবাসা, মেঘের বড় বোন । কি অসাধারণ নাম ।

আলম সাহেব ছেলেকে ডাকলেন,
মেঘ , তুমি বাবার সাথে এসো । চলো আমরা ট্রাক থেকে মালপত্রগুলো নামাতে সাহায্য করি ।
তোমার বোন ও আম্মু ভিতরে গোছগাছ করতে থাকুক ।
জি আব্বু ।

মিসেস ফাহমিদা মেয়েকে নিয়ে ভিতরে চলে গেলেন । মেঘের জন্য এ বাড়িতে আসা

কোনো ভাবেই সুখকর ছিল না । এ বাড়িতে আসা তাঁর জন্য ছিল অনেকটা পঞ্চাশ বছর আগের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার মতোই ।

আমি হঠাৎ করে উঠে দৌড়ে ওদের ট্রাকের সামনে গিয়ে দাড়ালাম । এক লাফে ট্রাকের উপরে উঠলাম ।
ধনী বাবা ও পুত্রকে সাহায্য করতে চাইলাম ।
কিন্তু মেঘের বাবা তা একেবারেই চাইলেন না ।
আমি একটা বক্স তুলে নিতে চাইলাম ।
মেঘের বাবা বাধা দিলেন আমাকে ।
বলেলেন
” আরে, না না । হাত দিবে না । এগুলোর ভেতরে মূল্যবান জিনিসপত্র আছে । যাও যাও ।

তোমার মা হয়তো তোমাকে খুঁজছেন ।
তুমি এখানে এসেছ তোমার মা জানেন?
মা জানেন ।
আমি এখানে রাস্তায় বসে থাকি যখন তখন ।
মা সেটা জানেন । তিনি কিছুই বলেন না ।

আমি একটি বাক্স নামাতে চাইলাম মেঘের সাথে । কিন্তু মেঘের বাবা আমাকে বললেন
না না । তুমি বাক্স ধরবে না । নামো । নামো বলছি ।
মেঘ তোমার বিকেলে কি যেনো করার কথা ছিলো মায়ের সাথে?

মেঘ বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে । তার ঠিক জানা নেই মায়ের সাথে কি কাজ আছে ।
বাবার চোখ টিপুনিতে সে বুঝতে পারে ।
বাবা চাইছেন না এই মেয়েটি এখানে তাদের সাথে থাকুক । মেঘ অভিনয় করে বলে,
ওহো তাইত । আমি গেলাম বাবা ।

মেঘ এক লাফে নীচে নেমে আসে ।
মেঘের সাথে আমিও নেমে আসলাম ।
মেঘ দৌড়ে ওদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে ।

আমি ওর পিছনে দৌড়াচ্ছি । আমরা এখন স্কুলের দৌড় খেলা খেলছি । দৌড়ে আমি ভালো । পিছন থেকে মেঘের হাত ধরলাম । আমি চেয়েছিলাম বিকেলটি মেঘের সাথে কাটুক খেলতে খেলতে । মেঘ আমার হাত ছাড়ার চেষ্টা করছে ।
আমি আরো শক্ত করে ধরলাম তাঁর হাত ।
মেঘ জোরাজুরি করতে থাকল ছাড়িয়ে নিতে ।

ওমা, কি নাম তোমার? এই তো আমার ছেলের
বন্ধু জুটে গেল । খুব ভালো হলো ।
মেঘের মাকে দেখে আমি হাত ছেড়ে দৃরে সরে আসি । মেঘ পলকের মধ্যে মায়ের পিছনে গিয়ে দাঁড়ায় । যেনো সে মহা বিপদ থেকে রক্ষা পেল ।
কি ভীতু ছেলে । আমি মনে হচ্ছে ভূত ।

আমার নাম “সুহাসিনী ” । এটা আমাদের বাড়ি ।
আমি আমাদের একতলা সাধারণ বাড়িটি দেখিয়ে বললাম । মেঘের মা আমাকে বললেন,
একদিন এসো মাকে নিয়ে আমাদের বাড়ি বেড়াতে।

ছেলেবেলায় আমি যা চাইতাম, তা হলো সুহাসিনীর কাছ থেকে নিজেকে দূরে থাকা । আমি এটাই চাইতাম , সে আমাকে একা থাকতে দিক ।
এই দুঃসহ সময় শুরু হয় যখন আমরা নিজেদের বাড়িতে এসে উঠি সেদিন থেকে ।
আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠেছি মাত্র ।
আমার জীবনে শুরু হল এক অসস্তিকর অধ্যায় । একদিকে সুহাসিনীর যন্রনা ।
অন্যদিকে শহরের শেষ মাথায় তৈরি এই বাড়িটি । আমার গ্রাম্য ভৌতিক সামাজিক জীবন ।

বাবা কায়দা করে আমাকে মায়ের সাথে কাজের বাহানা করে ট্রাক থেকে নামিয়ে দিলেন ।
কিন্তু কোনোকিছুই সুহাসিনীকে থামাতে পারল না । যখন সে আমার হাত ধরল আমি প্রায় বলতে যাচ্ছিলাম তাঁকে, ভাগ এখান থেকে মেয়ে ?

আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এক অচেনা মেয়ে আমার হাত ধরে রেখেছে ।
কি করে আমি যে এই বিচ্ছিরি অবস্থার মধ্যে পরে গেলাম । অবশেষে ঐ সাত বছর বয়সে আমার যা করা সম্ভব ছিল আমি তাই করেছিলাম ।
সুহাসিনীর হাত থেকে আমার হাত জোড় করে ছাড়িয়ে নিলাম ।

যাইহোক, আমার সমস্যা এখন বহু দূরে অতিক্রম করে এসেছি । নতুন স্কুলে সুহাসিনীর মতো কেউ আর যন্রনা করবে না । কিছুক্ষণের মধ্যে আমি
শ্রেনী কক্ষে প্রবেশ করলাম । আজ আমার প্রথম ক্লাস ।

মেঘ ? তূমি এখানে । সুহাসিনী আনন্দে দিশেহারা ।
সে দৌড়ে গিয়ে মেঘকে ঝাপটে ধরে ।
মেঘ আগের মতোই নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় ।

স্বাভাবিক ভাবেই স্কুল তো আর নির্জন অরন্য নয়
যে সেখানে কেউ থাকবে না ।
পুরো ক্লাসের ছাত্রছাত্রী হাসছে, মজা করছে আমাকে নিয়ে । আমি যখন টিফিন বিরতিতে শ্রেণীকক্ষ থেকে বের হলাম । আমার এক সহপাঠী এসে বলে, এই মেঘ তোমার বান্ধবী কই ?
আমার তখন মনে হচ্ছিল জীবনে এক ছাঁপ লাগিয়ে দিয়ে গেল সুহাসিনী মেয়েটি । (চলবে)