উন্নয়নে গাত্রদাহ ॥ এ কোন ব্যারাম?

প্রকাশিত: ৬:৪৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২২

হাসিবুর রহমান মানিক॥ মত-পথ, আদর্শ-চেতনা যে কোনো কারণে আওয়ামী লীগকে অপছন্দ হতে পারে। সরকারকে খারাপ লাগতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পছন্দ না-ই হতে পারে। সেই স্বাধীনতা ও অধিকার যে কারোই আছে। তাই বলে চলমান উন্নয়নও অসহ্য কেন? উন্নয়নে অসহিষ্ণুতা কি সুস্থতা? কে না জানে বর্তমান সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকায় উন্নয়ন অবিরাম দৃশ্যমান হচ্ছে। মানুষ সুফলও পাচ্ছে ।
দুর্নীতি, সুশাসনের অভাবসহ কিছু বিষয় নিয়ে অতৃপ্তি আছে অনেকের। শান্তি ও ন্যায়বিচার বা ন্যায্যতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেনি। বাংলাদেশের যেকোনো ভালো প্রস্তাব কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতির পাশাপাশি সুশাসন নিয়েও হাহাকার রয়েছে। এর বিপরীতে বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোলমডেল; অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, জাতীয় নির্বাচন, ডিজিটাইজেশন, এমডিজির লক্ষ্য অর্জন, জলবায়ুর প্রতিকূল প্রভাব মোকাবেলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ নানা সংস্থা এ দেশকে স্বীকৃতি ও পুরস্কারে ভূষিত করছে। ২০০৯ সালে বিশ্বমন্দা ও চরম খাদ্যাভাবকে সঙ্গী করে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতাসীন হন শেখ হাসিনা। এরইমধ্যে দেশ আবারও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। আওয়ামী লীগ ১২ বছর অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে বেশি সময় ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় রয়েছে।
জাতিসংঘ ২০১৫ সালে এসডিজি গ্রহণ করে। এটি ১৫ বছর মেয়াদি। এর উদ্দেশ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। জাতিসংঘ এর আগে সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) গ্রহণ করেছিল। এরপরই এসডিজি আসে। এসডিজির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য দূর করা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত ও লিঙ্গবৈষম্য প্রতিরোধ অন্যতম। ২০১৫ সালে এসডিজি গৃহীত হওয়ার পর এই প্রথম এর সূচকের স্কোর আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। এর কারণ হলো কোভিড মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া। বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশও কোভিড মোকাবিলায় কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যেও বাংলাদেশ অনেক সামাজিক সূচকেই ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে। সামাজিক বিভিন্ন অগ্রগতির সূচকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে তার ভূমিকা, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রশংসিত।
বৈশ্বিক মহামারি করোনার মাঝেও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতিময় রাখা শেখ হাসিনার সরকারের আরেক মিরাকল সাফল্য। ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই আর আগের মতো করতে হয় না। বরং জীবনকে বিচিত্র রকম বা ধরনে সাজাতে বড় উৎসুক সাধারণ মানুষ। কারণ তাদের ক্রয় ক্ষমতা আগে চেয়ে বেড়েছে। বেশ কিছু সূচকের উজ্জ্বলতা সম্ভাবনার আশা জাগিয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২১ এ রফতানি আয় ৪৮ মিলিয়ন ডলারের উপরে ছিল। সেপ্টেম্বরে এসে ৪৬ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এতে দেখা যায় ২ মিলিয়ন ডলার কমেছে! এর ফলে টাকার বিনিময় মূল্যও কমে গেছে। আগে টাকার বিনিময়মূল্য ছিল ৮৫.৫। টাকার অবমূল্যের কারণ আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া। এর ফলে উৎপাদনমূল্যও বেড়েছে। আবার ডলারের চাহিদা বাড়ার কারণেও টাকার মূল্য কমেছে। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে বিশ্ব এত বড় অর্থনৈতিক মন্দা আর কখনও দেখেনি। বাংলাদেশকে মোটামুটি নিস্তার দিতে পেরেছে সরকারের সময়োচিত নানা পদক্ষেপ। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও পুঁজি বাজারের সূচক বেড়েছে।
সরকারের বড় অর্জন কৃষির বহুমুখীকরণ ও খাদ্যে স্বয়সম্পূর্ণতা অর্জন। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রক্রিয়া হাতে নেয়া হয়েছে। বড় মাপের প্রণোদনা প্যাকেজ, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অর্থনীতি খুলে দেওয়ার মতো সরকারের সাহসী পদক্ষেপ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুবিন্যস্ত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিল্প-কারখানা খুলে দেওয়ার কারণে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে। এর মধ্যে বড় চমক ছিল লক্ষাধিক কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা। এতে ভেঙে পড়েনি উৎপাদনপ্রক্রিয়া। পাড়া-মহল্লার দোকান থেকে শুরু করে সুপারশপ, শপিং মল, বড় শিল্প-কারখানার চাকা সচল আছে। আমদানি-রপ্তানি, উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অনেকটাই স্বাভাবিক। আশপাশের কোনো কোনো দেশের কাছে এটি ঈর্ষনীয়। আমাদের সরকারবিরোধীরা তা আড়াল করতে চাইলেও বন্ধু রাষ্ট্রগুলো জানে, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল পাঁচটি অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম। জিডিপিতে বিশ্বে ৪১তম। গত এক দশকে দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৫ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এ সময়ে মাথাপিছু আয় তিনগুণ বেড়েছে।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। ২০১৪ সাল থেকে এ সূচকে বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর চাইতে এগিয়ে আছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’উদ্যোগ আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়নসহ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে সাড়া জাগিয়েছে। ব্যাপকভাবে ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী’কর্মসূচির সম্প্রসারণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রফতানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, তথ্য প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ, পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, রফতানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রোরেল, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন হচ্ছে। উন্নয়নের এ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ না মানা কি সাধারণ সৌজন্যতাও নির্দেশ করে?

বিজয়ের ৫০ বছরে  বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়ার এই অর্জন অস্বীকারের জো আছে?  অথচ সরকারের ধারাবাহিকতায় দেশের এগিয়ে যাওয়া গায়ের জোরে অস্বীকারের একটি বাতিক লক্ষণীয়। উন্নয়নকে ব্যঙ্গ করার নোংরামিও বাদ যাচ্ছে না।
দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে।  কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। দেশ থেকে মঙ্গা দূর হয়েছে। যা রূপকল্প-৪১ বাস্তবায়নের আলোর ঝলকানি দেখাচ্ছে। রূপকল্পটা শেখ হাসিনার তৈরি বলেই এতো গোস্যা? তা না করে প্রতিযোগিতায় আসতে সমস্যা কী? পারলে রূপকল্পকে আরো ১০ বছর এগিয়ে এনে ৩১ করতে বাধা আছে? কেউ নিষেধ করেছে? –মোটেই নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে শেখ হাসিনার অঙ্গীকর ছিল ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা। তা তিনি করেছেন। তার পরবর্তী লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশে পরিণত করা।
লেখকঃ সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র ঢাকা দক্ষিণ সিটি 
কাউন্সিলরঃ ২৬ নম্বর ওয়ার্ড ডিএসসিসি
উপদেষ্টা -বাংলা পোস্ট 
সাবেক সহ সম্পাদক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপ কমিটি